মাইকেল মধুসূদনের আবিভার্ব হয় বাংলার জাতীয় জীবনের এক যুগ সন্ধিক্ষণে।যে যুগে পশ্চাত্য ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব, পশ্চাত্য সমাজের রীতিনীতির প্রভাব বাংলার সমাজ ও সাহিত্যক্ষেত্রে আলোড়িত করে তোলে। অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে মাইকেল মধুসূদন বাংলা সাহিত্যে অবতীর্ণ হন। প্রকৃতি প্রদত্ত শক্তি, প্রতিভা এবং অসাধারণ আত্মপ্রত্যয়ের সাহায্যে বাংলার এই নবীন কবি পশ্চাত্য সাহিত্য থেকে নানা উপকরণ সংগ্রহ করে মাতৃভাষাকে পরিপুষ্ট করলেন। গাম্ভীর্য ও ভাষাবৈচিত্র্যে বাংলা ভাষাকে সম্মৃদ্ধ করে তুললেন।
বাংলা সাহিত্যের যুগান্তর সৃস্টিকারী কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ শে জানুয়ারী কপোতাক্ষ নদের তীরে যশোহর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে কায়স্থ পরিবারে জন্গ্রমহণ করেন।তাঁর বাবার নাম রাজনারায়ণ দত্ত, মা জাহ্ণবী দেবী।জুনিয়র স্কুলের পাঠশেষে ১৮৪১ সালে কবি হিন্দু কলেজের সিনিয়র ডিপার্টমেন্টে প্রবেশ করেন।হিন্দু কলেজে পড়ার সময় দুইজন ইংরেজ অধ্যাপকের প্রভাব তাঁর উপরে পড়ে। তাঁরা হলেন ডিরোজিও ও রিচার্ডসন।রিচার্ডসনের দ্বারা প্রাভাবিত হয়েই কবি ইংরেজীতে কবিতা লেখা শুরু করেন। হিন্দু কলেজে পড়ার সময় বিজাতীয় ভাব ও আদর্শে প্রভাবিত হয়ে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত হন ১৮৪৩ সালে।এরপর ১৮৪৯ সালে একদিন কাউকে কিছু না বলে কবি মাদ্রাজ চলে যান।তিনি মাদ্রাজের সাময়িক পত্রিকায় ইংরেজীতে প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। তাঁর ‘ক্যাপটিভ ল্যাডি’ ও ‘ভিশন অব দ্যা পাস্ট’এই সময়ের রচনা। কিন্তু ইংরেজীতে সাহিত্য রচনা কবিকে তৃপ্তি বা যশ কোনটাই দিতে পারেনি। তখন কবি মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনায় আত্মনিয়োগের উদ্দেশ্যে কল্কাতায় ফিরলেন১৮৫৬ সালে। মাদ্রাজ থেকে ফিরে কবি বেলগাছিয়া নাট্যশালার সাথে জড়িয়ে পড়েন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রথম দান ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’।
মাদ্রাজে থাকাকালীন কবি রেবেকা নামের এক স্কচ বংশীয় মেয়েকে বিয়ে করেন। এ বিয়ে স্থায়ী হয়নি। ১৮৫৬ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজেরধ্যাপকের মেয়ে হেন্রিয়েটাকে বিয়ে করেন।
আশৈশব কবির বিলেত যাওয়ার বাসনা ছিল। ১৮৬২ সালের ৯ই জুন কবি ব্যরিস্টারি পরার জন্য আবার বিলেত পাড়ি দেন। ১৮৬৬ সালে লন্ডনের গ্রেজিন ইউনিভার্সিটি হতে ব্যরিস্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু কবি ব্যরিস্টারিতে উন্নতি করতে পারেন নি। কবির অর্থকষ্ট ছিল প্রবল।তিনি শারীরীক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন ১৮৭১ সালে “হেক্টর বধ” প্রকাশ করার পর।
১৮৭৩ খ্রীস্টাব্দের ২৯ জুন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে ভাগ্যতাড়িত কবির বেদনাবিধূর জীবন নাট্যের সমাপ্তি ঘটে।
“বঙ্গের পঙ্কজ রবি গেল অস্তাচলে”
মহাকবি জীবনের অন্তিম পর্যায়ে জন্মভূমির প্রতি তাঁর সুগভীর ভালবাসার চিহ্ন রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় পংক্তিমালায়। তাঁর সমাধিস্থলে নিচের কবিতাটি লিখা রয়েছে:
| “ | দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে (জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি বিরাম)মহীর পদে মহা নিদ্রাবৃত দত্ত কূলদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন! |
” |
মধুসূদন বাংলা সাহিত্যের তাঁর অসাধারণ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। কাব্য, নাটক প্রহসন রচন করে তিনি বাংলা সাহিত্য যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন।
তথ্যসূত্রঃ মেঘনাদবধকাব্য ,
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-মাহবুবুল আলম
বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত-মুহাম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান (সম্পাদিত)
ও উইকিপিডিয়া