
পশ্চিমবাংলার ১৮৩৮ সালের ২৬ জুন (বাংলা ১৩ আষাঢ় ১২৪৫) চবি্বশ পরগনার নৈহাটি শহরের নিকটস্থ কাঠালপাড়া গ্রামে বঙ্কিমচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। হুগলী মহসিন কলেজে প্রেসিডেন্সি কলেজে তিনি লেখাপড়া করেন। ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। নব প্রতিষ্ঠিত কলাকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেদিন যারা গ্রাজুয়েট হওয়ার যোগ্যাতা অর্জন করেন তিনি তাঁদেরই একজন। বি এ পাশ করেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ডেপুটি কালেকটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সারা জীবন তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যান। স্বীকৃতি স্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাকে দুটি খেতাবে ভূষিত করে – ১৮৯১ সালে রায় বাহাদুর খেতাব এবং ১৮৯৪ সালে কম্প্যানিয়ন অফ দ্য মোস্ট এমিনেন্ট অর্ডার অফ দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার খেতাব।
বঙ্কিমচন্দ্র মাত্র ১১ বছর বয়সে পাঁচ বছর বয়সী মেয়েকে বিয়ে করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে তার প্রথম স্ত্রী মোহিনী মারা যাওয়ায় ১৮৬০ সালে ২২ বছর বয়সে বঙ্কিম আবার বিয়ে করেন। বঙ্কিমের দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম রাজলক্ষ্মী দেবী। বঙ্কিমের তিন মেয়ে, তাদের কোনো পুত্র ছিল না। ৪০ বছর বয়সে বঙ্কিমচন্দ্র ক্রমে রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তার ডায়াবেটিস হয়েছিল। সে আমলে এ রোগের তেমন কোনো ওষুধ ছিল না। এ রোগ খুব বেড়ে যাওয়ার কারণে ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল কলকাতায় নিজের বাড়িতে বঙ্কিমচন্দ্র মাত্র ৫৬ বছর বয়সে মারা যান।
তখনকার অন্যান্য লেখকের মত তিনিও প্রথমে ইংরেজীতে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন।এই প্রচেষ্টার প্রথম নিদর্শনস্বরূপ “Rajmohan;s Wife”(১৮৫২) নামক উপন্যাসটি রচনা করেন। কিন্তু বিদেশী ভাষায় সাহিত্য রচনা করে পরিতৃপ্তি না পেয়ে বাংলায় সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর প্রথম বাংলা উপন্যাস “দুর্গেশনন্দিনী” রচনা একদিকে যেমন তাঁর মৌলিক প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেয় অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যরসিক মন এক অভিনব সাহিত্যশিল্প রস্বাদন করতে সক্ষম হয়।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যিক জীবনের বাইশ বছরে চৌদ্দটি উপন্যাস রচনা করেন।
১। দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫)
২। কপালকুন্ডলা (১৮৬৬)
৩। মৃণালিনী (১৮৬৯)
৪। বিষবৃক্ষ (১৮৭৩)
৫। ইন্দিরা (১৮৭৩)
৬। যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪)
৭। রাধারানী (১৮৭৫)
৮। চন্দ্রশেখর (১৮৭৫)
৯। রজনী ( ১৮৭৭)
১০। কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮)
১১। রাজসিংহ (১৮৮১)
১২। আনন্দমঠ (১৮৮২)
১৩। দেবী চৌধুরানী (১৮৮৪)
১৪। সীতারাম (১৮৮৭)
উপন্যাস রচনায় তিনি প্রখ্যাত ইংরেজ উপন্যাসিক স্যার ওয়াল্টার স্কটের রোমান্সাশ্রয়ী ঐতিহাসিক উপন্যাসের আদর্শের অনুসারী ছিলেন। আবার সামাজিক পারিবারিক কথাসাহিত্যের আশ্রয়েও উপন্যাস রচন করেন।
উপন্যাসের শ্রেনীবিভাগ করলে কতগুলো ঐতিহাসিক উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত বলে উল্লেখ করা যায়। যদিও বঙ্কিমচন্দ্র নিজে শুধু “রাজসিংহ”-কেই ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।এটা ছাড়াও আরো অনেক উপন্যাসে ঐতিহাসিক ঘটনার সংযোজন করেন। তবে সেসব উপন্যাসে ঐতিহাসিকতার চেয়ে মানবজীবনের বিচিত্রতর বৈশিষ্ঠ্য দেখানোই প্রধান উদ্দেশ্য বলে মনে হয়।
প্রথম উপন্যাস “দুর্গেশনন্দিনী ” র সঙ্গেইতিহাসের যোগ সামান্য। “মৃণালিনী ” তে ত্রয়দশ শতকের প্রআথমিক পর্যায়ে মুসলমানদের দ্বারা বাংলা বিজয়ের কাহিনী উপজীব্য।এ উপন্যাসে ঐতিহাসিকতা থাকলেও নায়িকার অন্তর প্রকৃতির রহস্যা উদঘাটনই প্রধান বিষয়।”চন্দ্রশেখর ” উপন্যাসের প্রাধান বিষয় ইংরেজ শান প্রতিষ্ঠা ও মীর কাসিমের সঙ্গে ইংরেজদের সংগ্রাম।
“আনন্দমঠ”, “দেবী চৌধুরানী” , “সীতারাম”-কে রাজনৈতিক উপন্যাসের পর্যায়ে স্থান দেয়া হয়। এই উপন্যাসগুলোতে দেশাত্মবোধ ,স্বজাত্যবোধ ও গীতায় উক্ত নিষ্কাম ধর্ম্মতের প্রচারক।
বঙ্কিমচন্দ্রের কতগুলো উপন্যাসে দ্বন্ধীন অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছে। “দুর্গেশনন্দিনী “, “কপালকুন্ডলা” , “মৃণালিনী ” , ” যুগলাঙ্গুরীয়”, “রাধারানী “, “ইন্দিরা” এই পর্যায়ে পড়ে।
উপন্যাসের মত প্রবন্ধ সাহিত্যেও তিনি সমান দক্ষতা দেখান। তাঁর “কৃষ্ণকান্তের দপ্তরে”(১৮৭৫) কোউতুক্রসের স্নিগ্ধছটা ও ব্যঙ্গের তীব্র কষাঘাত চমত্কারভাবে রূপায়িত হয়েছে। “লোকরহস্য”, “মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত” তাঁর অপর ব্যঙ রচনা।
“বিজ্ঞানরহস্য” , “বিবিধ সমালোচনা” , “রায় দীনবন্ধুমিত্র বাহাদুরের জীবনী” , “সাম্য”, “প্রবন্ধ পুস্তক”, “কৃষ্ণচরিত্র”, “বিবিধ প্রবন্ধ”, “ধর্মতত্ত্ব” তাঁর রচিত প্রবন্ধ গ্রন্থ।
বঙ্কিমচন্দ্র একটি বিখ্যাত বাংলা সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকাটির নাম ‘বঙ্গদর্শন’। ১৮৭২ সালে এই পত্রিকা বের হয়। ইংরেজি শিক্ষিত আধুনিক বাঙালি লেখকরা এই পত্রিকায় লিখেছেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নিজস্ব রচনারীতিতে অসাধারণ মৌলিকতা অনবদ্য বৈশিষ্ঠ্যের সাথে প্রকাশিত হয়েছে যা তাকে এনে দিয়েছে “সাহিত্য সম্রাটের” মর্যাদা।তিনি বাংলা সাহিত্যকে গৌরবমন্ডিত স্থানে উন্নীত করেছেন। তাঁর অসাধারণ কল্পনাপ্রবণতার বাহন হিসেবে এসেছে তাঁর অনবদ্য ভাষা-বাংলা গদ্যের সাহিত্যিক কাঠামোর উৎকর্ষপূর্ণ রূপ। ফলে বাংলা সাহিত্য সগোউরব অগ্রগতির দিকনির্দেশনা লাভ করল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে।
তথ্যসূত্রঃ
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-মাহবুবুল আলম
বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত-মুহাম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান (সম্পাদিত)
ও উইকিপিডিয়া