১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। চুরুলিয়া গ্রামটি আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া ব্লকে অবস্থিত। পিতামহ কাজী আমিনউল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয়া পত্নী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। তার বাবা ছিলেন স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম| তারা ছিলেন তিন ভাই এবং বোন। তার সহোদর তিন ভাই ও দুই বোনের নাম হল: সবার বড় কাজী সাহেবজান, কনিষ্ঠ কাজী আলী হোসেন, বোন উম্মে কুলসুম। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল “দুখু মিয়া”| তিনি স্থানীয় মক্তবে (মসজিদ পরিচালিত মুসলিমদের ধর্মীয় স্কুল) কুরআন, ইসলাম ধর্ম , দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে যখন তার পিতার মৃত্যু হয়, তখন তার বয়স মাত্র নয় বছর। পারিবারিক অভাব অনটনের কারণে তাঁর শিক্ষা বাধাগ্রস্থ হয় এবং মাত্র দশ বছর বয়সে তাকে নেমে যেতে হয় জীবিকা অর্জ্জনে। ১৯১০ সালে নজরুল লেটো দলে যোগ দেন। লেটো দল থেকে ফিরে গিয়ে আবার রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজস্কুলে ফিরে যান।১৯১৭ সাল পর্যন্ত এখানেই পড়াশোনা করেন।
১৯১৭ সালে ঞ্জরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান। ১৯১৭-২০ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে ছিলেন। সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯২০ সালে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়া হয়। এরপর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় চলে আসেন।
কলকাতায় এসে কবি ৩২ নং কলেজ স্ট্রীটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। তাঁর সাথে সমতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজাফফর আহমেদ ও ছিলেন। এখান থেকেই তাঁর সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। প্রথম দিকে ‘মোসলেম ভারত’ , ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পত্রিকা’ , ‘উপাসনা’ প্রভৃতি পত্রিকায় কিছু লেখা প্রকাশিত হয়।
১৯২০ সালে ‘নবযুগ’ নামে একটি সন্ধ্যা পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। এর সম্পাদক ছিলেন এ কে ফজলুল হক। এ পত্রিকার মাধ্যমে কবি নজরুলের নিয়মিত সাওংবাদিকতা শুরু হয়।
১৯২১ সালে কবি আলী আকবর খানের সাথে পরিচিত হন।তাঁর সাথেই তিনি কুমিল্লার বিরজাসুন্দরীর বাড়িতে যান।এখানেই পরিচিত হন প্রমিলার সাথে।যার সাথে কবির বিয়ে হয়। প্রমিলাকে বিয়ের আগে নজরুল নার্গিস অসার খানমকে বিয়ে করেছিলেন। নার্গিস ছিলেন আলী আকবর খানের ভগ্নী। কিন্তু কাবিন নামায় ঘরজামাই থাকার শর্ত থাকায় কবি বিয়ের দিনেই নার্গিসকে ফেলে চলে আসেন।
দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে কবি ও পথে নেমে আসেন। ২১ শে নভেম্বর দেশব্যপি হরতাল পালিত হলে কবি অসহযোগ মিছিলের সাথে কুমিল্লা শহর প্রদক্ষিণ করেন এবং গান করেন ,
“ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও, ফিরে চাও ওগো পুরবাসী”
এ সময় লিখিত “বিদ্রোহী” কবিতাটি আন্দোলনে যেমন একটা বেগ আনে তেমনি সাহিত্য খ্যাতিও লাভ করে। তাঁর প্রকাশিত “ধুমকেতু” পত্রিকায় অশযোগ অ খেলাফত আন্দোলের পক্ষে লেখা প্রকশিত হয়। এই সব কারণে কবি ব্রিটিশ সরকারের রোষে প্রেন । কবিকে বন্দী করে এক বছ্রের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডীত করা হয়।
বেতারে কাজ করার সম্য কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় কবি উপাধি দেন। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট কবি মৃত্যুবরণ করেন।
নজরুল ইসলাম তিনটি উপন্যাস, প্রবন্ধ,ছোটগল্প ও প্রায় ২৫০০ হাজারেরমত গান রচনা করেছেন। তাঁর উপন্যাসের নাম – মৃত্যুক্ষুধা,কুহেলিকা,বাধনহারা।নজরূল তাঁর রচিত উপন্যাসগুলোতে স্বীয় বিশিষ্টতা প্রদর্শন করেছেন।তাঁর তিনটি উপন্যাসেই বিপ্লব ও সন্ত্রাসবাদের পটভূমিতে দেশপ্রেমের ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তুলেছেন।
তাঁর প্রথম গল্প সংকলন “ব্যথার দান“। এছড়া “রিক্তের বেদন‘ ” ও ” শিউলিমালা” তাঁর রচিত গল্পগ্রন্থ। তাঁর রচিত আঠারটি ছোটগল্প এই তিনটি গল্পগ্রন্থে সংকলিত।তাঁর গল্পের ঐতিহাসিক মূল্য এখানে যে , রবীন্দ্রলালিত ও বাংলা গল্পের অন্যন্য ঐতিহ্যপুষ্ট লেখক গোষ্ঠীর থেকে তাঁর গল্প পৃথক ও বিশিষ্ট।
রবীন্দ্রযুগে রবীন্দ্রপ্রভাব মুক্ত হয়ে ধুমকেতুর মত বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব। তাঁর স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলা সাহিত্যে তিনি আলোড়ন তুললেন।মানবের মঙ্গল সাধনের জন্য তিনি লেখনী ধারণ করেছিলেন। তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন –”মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই – নহে কিছু মহিয়ান”। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ “অগ্নিবীনা“(১৯২২) বাংলা কাব্যের চিরাচরিত ধারায় ব্যতিক্রম সৃষ্টি করে। ধ্বনি বিন্যাসের নতুন প্রযন্তে, শব্দ ব্যবহারের একটি হিল্লোলিত তরঙ্গাতে, বক্তব্যের একটি নিশ্চিত উদ্দাম দ্বিধামুক্ত গতিতে বাংলা কাব্য “অগ্নিবীনা” অভিনব সংযোজন। “অগ্নিবীনা” র সুর আরো উচ্চকিত হল ‘বিষের বাঁশি’তে (১৯২৪)।
‘সাম্যবাদী’(১৯২৫),‘সর্বহারা’(১৯২৬), ‘ফণিমনসা’(১৯২৭)-এ তিনটি কাব্যগ্রন্থে নজরুল ইসলাম গণ আন্দোলনের সংগ্রামী কবি হিসেবে নিজেকে উপস্থিত করলেন।
দেশের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ কবির মনে আঘাত করে। কবি এ সময় ‘সিন্ধু হিন্দোল’(১৯২৭),‘বুলবুল‘(১৯২৮), ‘চোখের চাতক’(১৯২৯) ও ‘চক্রবাক’ রোমান্টিক কাব্য রচনায় মনোযোগ দেন। কিন্তু বেশিদিন নিরাসক্ত থাকা কবির পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি নিপীড়িত জন্তার আর্ত্নাদ শুনেছেন এবং বিপ্লবের বাণী উচ্চারণ করেছেন ‘সন্ধ্যা’(১৯২৯), ‘প্রলয় শিখা’(১৯৩০), ‘চন্দবিন্দু’(১৯৩০)তে।
এছাড়া ও ‘দোলনচাঁপা’, ‘ভাঙ্গার গান’,'ছায়ানট’,'পূবের হাওয়া’, ‘চিত্তনামা’, ‘ঝিঙেফুল’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘জিঞ্জীর’, ‘নতুন চাঁদ’, ‘মরু ভাস্কর’ প্রভৃতি তঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ।
তাঁর গানের বই ‘সুরসাকী’,'জুলফিকার’, ‘ব্নগীতি’, ‘গুলবাগিচা’, ‘গানের মালা’ ‘গীতি শতদল‘ প্রভৃতি।
নজরুলের রচিত নাটক ‘আলেয়া’, ‘মধুমালা’, ‘ঝিলিমিলি’ ‘পুতুলের বিয়ে’।
তথ্যসূত্রঃ
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-মাহবুবুল আলম
বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত-মুহাম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান (সম্পাদিত)
ও উইকিপিডিয়া