মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা কাব্যসাহিত্যে আধুনিক যুগের প্রবর্তক। তিনি বাংলা কাব্যসাহিত্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে সম্পূর্ণ নতুন এক কাব্যধারার সূচনা করেছিলেন এবং তাঁর বলিষ্ঠ প্রতিভার দানে বাংলা সাহিত্যকে করেছেন সমৃদ্ধ।এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন,
”নবযুগের প্রাণবান সাহিত্যের স্পর্শে কল্পনাবৃত্তি যেই নবপ্রভাতে উদ্বোধিত হল,অমনি মধুসূদনের প্রতিভা তখনকার বাংলাভাষার পায়ে চলা পথকে আধুনিক কালের রথ যাত্রার উপযোগী করে তোলাকে দুরাশা মনে করলেন না।আপন শক্তির পরে শ্রদ্ধা ছিল বলেই বাংলা ভাষার পরে কবি শ্রদ্ধা প্রকাশ করলেন।বাংলা ভাষাকে নির্ভীকভাবে এমন আধুনিকতায় দীক্ষা দিলেন , যা তার পুর্বানুবৃত্তি থেকে সম্পূর্ন সতন্ত্র।বঙ্গবাণীকে গম্ভীর সরনির্ঘোষে মন্দ্রিত করে তোলার জন্য সংস্কৃত ভান্ডার থেকে মধুসূদন নিঃসঙ্কোচে যেসব শব্দ আহরন করতে লাগলেন সেও নতুন; বাংলা পয়ারের সনাতন সমবিভক্ত আল ভেঙ্গে দিয়ে তার ওপরে অমিত্রাক্ষরের যে বন্যা বইয়ে দিলেন সে নতুন।আর মহাকাব্য, খন্ডকাব্য রচনার যে রীতি অবলম্বন করলেন , তাও বাংলা ভাষায় নতুন। এটা ক্রমে ক্রমে পাঠকের মনকে সইয়ে সইয়ে সাবধানে ঘটল না,শাস্ত্রিক প্রথায় মঙ্গলাচরনের অপেক্ষা না রেখে কবিতাকে বহন করে নিয়ে এলেন এক মুহূর্তে ঝড়ের পীঠে-প্রাচীন সিংদারের আগল ভেঙ্গে।“
এই বিরাট প্রতিভাসম্পন্ন কবি ১৮২৪ খ্রীস্টাব্দের ২৫শে জানুয়ারী যশোহর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।জুনিয়র স্কুলের পাঠ শেষে কবি ১৮৪১ সালে হিন্দু কলেজে প্রবেশ করেন।হিন্দুকলেজে লেখাপড়া করার সময়েই তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে।মধুসূদনের ধর্মান্তরিত হওয়ার তাৎপর্য সম্পর্কে কাজী আব্দুল ওদুদ তাঁর “শাশত বঙ্গ’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন,
তাঁর এই ধর্মান্তর গ্রহ্ণ তাঁর নিজের জন্য যত বড় দুঃখের কারণ হোক জাতির জন্য প্রকৃতই হয়েছে এক মহালাভের ব্যাপার।“
মধুসূদন তাঁর সাহিত্যিক জীবনের প্রথম দিকে ইংরেজীতে লেখালেখির চেষ্টা করেন ।তাঁর “ক্যাপটিভ লেডী” ও “ভিশন অফ দ্যা পাস্ট” সে সময়ের রচনা। কবি পরে নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনা শুরু করেন।বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রথম দান “তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য”( ১৮৬১)।এটি তাঁর প্রথম রচনা হলেও নাটক “শর্মিষ্ঠা”(১৮৫৬)-ই তাঁর প্রতিভার পূর্ণ উম্মেষ ঘটে। তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যর পরই কবি “মেঘনাদবধ” কাব্য দুই খন্ডে প্রকাশ করেন।তারপর প্রকাশিত হয় তাঁর “ব্রজাঙ্গনা”(১৮৬১,জুলাই) এবং “বীরাঙনা”(১৮৬২)। মধুসূদনের উল্লেখযোগ্য দুটি প্রহসন “একেই কি বলে সভ্যতা”(১৮৬০) ও “বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ”(১৮৬০)।ইউরোপ প্রবাসকালে রচিত তাঁর “চতুর্দশপদী কবিতাবলী”(১৮৬৫) সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।১৮৭১ সালে কবির জীবনের শেষভাগে মহাকবি হোমারের “ইলিয়ড” নামক মহাকাব্যের উপখ্যান ভাগ অবল্মবনে রচিত “হেক্টরবধ”। এর পরই কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৮৭৩ সালের ২৯শে জুন “বঙ্গের পঙ্কজ রবি গেল অস্তাচলে”।
মধুসূদন খুব অল্প সময় বাংলা সাহিত্যের সেবার সুযোগ পেয়েছেন।কিন্তু এই অল্প সময়ে বাংলা সাহিত্যে তাঁর যে দান তার সাথে অন্য কোন কবির তুলনা হয়না।
তথ্যসূত্রঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস–মাহবুবুল আলম